চাওয়া পাওয়ার পেছনের অদৃশ্য তৃষ্ণা

চাওয়া পাওয়ার পেছনের অদৃশ্য তৃষ্ণা

প্রাকৃতিক ঝরনা ও সবুজ দৃশ্য, মানসিক প্রশান্তির প্রতীক

মানুষ চায়। ছোটবেলা থেকেই আমাদের মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার একটি প্রবণতা জন্ম নেয়। কেউ চায় খেলনা, কেউ চায় পড়াশোনায় প্রথম হতে, কেউ চায় অর্থ, কেউ চায় খ্যাতি। কিন্তু এই চাওয়াগুলো শেষ হয় না। একটির পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আরেকটি চাওয়া মাথা তুলে দাঁড়ায়। কখনো কখনো মনে হয়, জীবনের সব অর্জন একত্র করেও মনের সেই অদৃশ্য শূন্যতাকে পূরণ করা যায় না।

এই চাওয়া যেন এক অদৃশ্য তৃষ্ণা। পানির মতো—পিপাসা মেটে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার লাগে। এই চাওয়া আমাদের চালিত করে, কর্মে উৎসাহ দেয়, কিন্তু যদি আমরা সচেতন না হই, তবে সেটি আমাদের মন ও জীবনকে অস্থির করে তোলে।

মানুষ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে, তৃপ্তির প্রতীক

অসন্তুষ্টির মূল শিকড়

আমাদের এই চাওয়া যখন সীমাহীন হয়ে যায়, তখন তা এক রকম মানসিক অস্থিরতায় রূপ নেয়। একটা নতুন মোবাইল, একটা ভালো চাকরি, একটু ভালো ঘর, আরও ভালো গাড়ি—সবই চাই। কিন্তু পাওয়ার পরেও যেন কিছু একটা অসম্পূর্ণ থাকে। কেন? কারণ মনের গভীরে আমরা আসলে শান্তি খুঁজি, কিন্তু বাইরের জিনিসে সেই শান্তি নেই।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:

“নিশ্চয়ই আল্লাহর জিকিরেই হৃদয়সমূহ শান্ত হয়।” (সূরা রা’দ, আয়াত: ২৮)

অর্থাৎ, বাহ্যিক চাওয়া-পাওয়া দিয়ে হৃদয়ের অস্থিরতা দূর হয় না যতক্ষণ না মনের গভীরে আল্লাহর স্মরণ ও তাওয়াক্কুল স্থাপন করি।

নদীর পাশে একাকী বসা মানুষ

তৃষ্ণা মেটানোর পথ কী?

  • নিজের চাওয়াগুলো বিশ্লেষণ করুন—কোনটা আসল, কোনটা সাময়িক।
  • আল্লাহর ওপর ভরসা ও কৃতজ্ঞতা চর্চা করুন।
  • অন্যের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত রাখুন—এতে অন্তর প্রশান্ত হয়।
  • প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় আত্মজিজ্ঞাসা করুন: আমি যা চাই, তা কি আমার জন্য ভালো?

প্রকৃত প্রশান্তি আসে তখনই, যখন মানুষ তার চাওয়ার সীমা নির্ধারণ করতে শেখে এবং মনে রাখে, সব কিছু পাওয়া এই দুনিয়াতে সম্ভব নয়। হাদীসে এসেছে:

“একজন মানুষের একটি উপত্যকা পরিমাণ স্বর্ণ থাকলে সে আরেকটি চায়; মানুষের পেট কেবল মাটি ভরাবে।” (সহীহ বুখারী)

সূর্যাস্তের সময় ধ্যানমগ্ন দৃশ্য

কেন কিছুতেই মন ভরে না?

কারণ, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে পরীক্ষার জন্য। এই পৃথিবী শান্তির নয়, শান্তির অন্বেষণের স্থান। আমাদের হৃদয়ে চাওয়া থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই চাওয়া যদি আল্লাহর স্মরণ, কৃতজ্ঞতা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত না হয়, তাহলে তা এক সময় দুঃখ ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা ভুলে যাই যে, একদিন এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই সাময়িক জীবনে চাওয়া-পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ কতটাই না ক্ষণস্থায়ী!

আসল চাওয়া কী হওয়া উচিত?

আমাদের চাওয়া হওয়া উচিত আত্মার উন্নতি, পরকালীন মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যদি আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তাহলে জীবনের ছোট ছোট না-পাওয়া গুলো আর কষ্টের কারণ হবে না।

সমুদ্র ও শান্তির প্রতীক রোদেলা দৃশ্য

শেষ কথা

চাওয়া খারাপ নয়, কিন্তু সেটি যখন নিয়ন্ত্রণহীন ও সীমাহীন হয়, তখনই তা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের উচিত আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে চাওয়ার গন্তব্য ঠিক করা এবং অন্তরের অদৃশ্য তৃষ্ণাকে সঠিকভাবে চিনে নেওয়া। মনে রাখুন, আত্মার সত্যিকার প্রশান্তি আসে তখনই, যখন অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা ও ভরসা স্থাপন হয়।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে অন্তরের শান্তি ও পরিপূর্ণতা দান করুন। আমিন।